Connect with us

আন্তর্জাতিক

প্রেস-পাস-ফিনিশঃ গোলকধাঁধার উত্তর কোথায়?

পৃথিবীর সব দেশে ফুটবলটা শেখানো হয় তৃণমূল পর্যায়ে। তৃণমূল বলতে ফুটবলীয় ভাষায় বয়সটা হল ৮-১২ বছর।

প্রকাশিত

তারিখ

প্রেস-পাস-ফিনিশঃ গোলকধাঁধার উত্তর কোথায়?
বাংলাদেশ ফুটবল। ছবিঃ ফিফা

প্রশ্নটা মূলত আবার উঠেছে আফগানিস্তান ম্যাচের পর। তাজিকিস্তানের দুশানবেতে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের সে ম্যাচে বাংলাদেশের অতিমাত্রার রক্ষণাত্মক মানষিকতা, বলের দখল রেখে পাসিং ফুটবল খেলার প্রচেষ্টার অভাব সাধারণ চোখেই ফুটে উঠেছিল। সাথে ছিল বিপক্ষের প্রেসিংয়ে বল হারানো, বল নিজের পায়ে রাখতে না পারার মত সমস্যা।

ম্যাচ শেষে খেলার বিশ্লেষণে অনেকেই দলের রক্ষণাত্মক মানষিকতাকে দুষছেন, কেওবা খেলোয়ারদের দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

প্রতিবার জাতীয় দলের ম্যাচ আসে, ম্যাচ যায়। চায়ের কাপে ঝড় ওঠে, আবার মিলিয়ে যায়। কিন্তু পেছনের কারণের দিকে আমাদের নজর পড়ে না।

প্রথমত, আমাদের খেলোয়াড়রা খেলে কোথায়? আমাদের নিজেদের লীগে। আমাদের লীগের দলগুলো কি পাসিং ফুটবলের অনুসারী না? অবশ্যই, আমাদের লীগেই ৩-৪ টি দল খুব ভাল পাসিং ফুটবল খেলে।

গত লীগে বসুন্ধরা কিংসের ৩২ পাসের গোল নিয়ে আলোচনা হয়েছিল অনেক। মারুফুল হক স্যারের আরামবাগের পাসিং ফুটবল তো চোখ জুড়ানো। আবাহনীও কোচ মারিওর অধীনে বেশ ভাল পাসিং ফুটবল খেলছে।

তাহলে সমস্যাটা কোথায়? সমস্যা আমাদের খেলার ধরণে।

বর্তমান সময়ে ফুটবল খেলার কৌশল খুব দ্রুতই বিবর্তন হচ্ছে। এখনকার অধিকাংশ ট্যাক্টিক্সেই বল বিল্ডআপ এবং দ্রুত পাস করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের খেলায় দল এবং খেলোয়াড় দুই ক্ষেত্রেই সেই ফার্স্ট টাচ এবং বল হোল্ড করে বিল্ডআপ প্লেতে যাওয়াটা এখনো সেভাবে গুরুত্ব পায়না।

একজন খেলোয়াড় যখন শারীরিকভাবে এগিয়ে থাকা এবং দ্রুতগতির প্রতিপক্ষের সাথে খেলতে যাবেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাকে ফার্স্ট টাচে দক্ষ হতে হবে। বল বেশিক্ষণ পায়ে রাখা যাবেনা, দ্রুততার সাথে পাসের দক্ষতা বাড়াতে হবে।

ইউরোপীয়ান লীগে একজন খেলোয়াড় গড়ে পায়ে বল রাখে ০.৫-১.৫ সেকেন্ড। সেখানে এশিয়ান প্লেয়াররা বল রাখে ১.৫-৩ সেকেন্ড। স্বাভাবিকভাবেই এশিয়ান অঞ্চলে খেলার বিল্ডআপে সময় বেশি লাগছে।

এর পেছনে অবশ্য আমাদের খাবার, আবহাওয়া, শারীরিক সক্ষমতা অনেক কিছুই দায়ী। এবার আসি লীগে।

লীগে যখন আমাদের দলগুলো আক্রমণে যায়, বল বিল্ডআপ করে তখন কয়টা বিপক্ষ দল তার প্রতিপক্ষকে একদম নাভিশ্বাস ওঠানোর মত প্রেস করে?

আমাদের লীগে আমাদের খেলোয়াড়রা বিপক্ষের প্রেস রেজিস্টেন্সের শিকার হয়না বললেই চলে। ফলে সে সামনের বা পেছনের খেলোয়াড়কে দেখে শুনে পাস দিতে পারে বা নিজেই বল নিয়ে সামনে এগুতে পারে।

ঠিক এই খেলোয়াড়টিই যখন আন্তর্জাতিক ম্যাচে দ্রুতগতির এবং আগ্রাসী প্রতিপক্ষের সামনে পড়ে, সে ভড়কে যায়। কারণ সে তো লীগে স্বচ্ছন্দে বল নিয়ে কাড়িকুড়ি করতে অভ্যস্ত।

ফলাফল চলে আসে ভীতি এবং মানসিক চাপ। ভুল পাস, সামনে প্লেয়ার থাকার পরও লং বল বাড়ানো, প্রেসিংয়ে বল হারানো।

এবার আসি অন্য প্রসঙ্গে। ফুটবল যতটা না পায়ের খেলা, তার চেয়েও মাথার খেলা বেশি এখানে। ফুটবলের একটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হল নিজেদের মধ্যে মানষিক যোগাযোগ। আপনি যদি প্রতিটা খেলোয়াড়ের চিন্তাভাবনা পড়তে না পারেন, এতগুলো পাস খেলা কখনোই সম্ভব না।

আপনি হয়ত বল পাস দিবেন একজায়গায়, আপনার সতীর্থ অবস্থান নিবে অন্য জায়গায়। অথবা আপনার নিজের বলের উপর নিয়ন্ত্রণ না থাকায় নিজেই প্রতিপক্ষের প্রেসের শিকার করে বল হারানোর মত অবস্থায় চলে যাবেন। তখনই আসে উদ্দেশ্যহীন লং বল, ভুল পাস, বলের নিয়ন্ত্রণ হারানো।

আমাদের দেশে কয়জন মিডফিল্ডার আছেন যারা বল ছাড়া নিজেদের মুভমেন্ট দিয়ে প্রতিপক্ষকে বোকা বানাতে পারেন, সম্ভবত খুবই কম।

দোষটা কি শুধুই খেলোয়াড়ের? মোটা দাগে উত্তর আসবে, না।

ফিনিশিংয়ে বাংলাদেশের ফরোয়ার্ডদের সমস্যা অনেক আগের রোগ। এ নিয়েও আছে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা।

এ গোলকধাঁধা থেকে বের হওয়ার উপায়টা কি? উপায়টা আছে আমাদের কাছেই। তবে সে জন্য খেলোয়ারসহ ফুটবল সংশ্লিষ্ট সবারই মানষিকতার পরিবর্তন দরকার।

পৃথিবীর সব দেশে ফুটবলটা শেখানো হয় তৃণমূল পর্যায়ে। তৃণমূল বলতে ফুটবলীয় ভাষায় বয়সটা হল ৮-১২ বছর। এ সময় তারা ফুটবলের মৌলিক বিষয়গুলো শিখবে। নিজেদের কাড়িকুড়ি দেখাবে মনের খুশিতে। থাকবে না কোন চাপ।

১৪ বছর বয়স পর্যন্ত ফুটবলের মৌলিক নিয়মের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেয়া, শরীর গঠন সব সমানতালে চলে। ১৫ বছর থেকে শুরু হয় ট্যাক্টিকাল জ্ঞান অর্জন। ১৮ বছরের আগেই সে একজন পরিপূর্ণ জ্ঞান সমৃদ্ধ ফুটবলার।

আমাদের দেশে অধিকাংশ ফুটবলাররা বেসিকই শেখা শুরু করে ১৪-১৫ বছর বয়সে। কেও কেও সে সুযোগও পায়না। হয়না প্রতিভার বিকাশ, হয়না জাত ফুটবলার হওয়ার পরিপূর্ণ সুযোগ।

যেখানে আপনি মৌলিক জ্ঞান নিতে নিতেই শেখার সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে, সেখানে পাসিং, প্রেসিং, বিল্ডআপ প্লে দিয়ে একজন খেলোয়াড় ম্যাচ ঘুড়িয়ে দিবে সে আশা করেন কিভাবে।

তাই ঘুরেফিরে সেই একাডেমির প্রয়োজনীয়তাই উঠে আসবে আবার। অন্তত ক্লাবগুলোর নিজেদের মানসম্মত খেলোয়াড় পাওয়ার জন্য নিজেদের একাডেমির খুব প্রয়োজন। যেখান থেকে পরিপূর্ণ ফুটবল জ্ঞান সমৃদ্ধ ফুটবলার বের হয়ে আসবে, যারা যে কোন ট্যাক্টিক্সের জন্য মানানসই হবে।

আশার কথা, অন্তত দেরীতে হলেও দু-তিনটি দল নিজেদের বয়সভিত্তিক দল এবং একাডেমি করার দিকে নজর দিয়েছে।

এবার ফিনিশিং সমস্যা। এ সমস্যাও উপরের সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখা যায়। এখানে বাফুফে, ক্লাব যতটা না দায়ী তারচেয়ে কোন অংশে কম দায়ী নয় আমাদের খেলোয়াড়রা।

আমাদের ফরোয়ার্ডরা কখনোই অনুশীলন, কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজের স্কিল বাড়ানোর প্রতি সচেতন ছিলেন না। নিজের যতটুকু দক্ষতা সেটা ব্যবহার করেই কাজ চালিয়ে নেয়ার প্রচেষ্টা ছিল বেশিরভাগ সময়। ছিল আত্মনিবেদনের অভাব।

তার চেয়েও বড় সমস্যা নিজের ক্যারিয়ারের দিকে না তাকিয়ে টাকার পেছনে ছোটা। ফরোয়ার্ডদের নিজেদের দক্ষতা ঝালাইয়ের সবচেয়ে বড় শর্ত হল বেশি বেশি ম্যাচ খেলা। যত ম্যাচ খেলবে তত গোল করার সুযোগ তৈরি হবে।

আমাদের দেশে দেখা যায়, বড় ক্লাব থেকে বড় অঙ্কের অফার আসলেই প্লেয়িং টাইম, নিজের ক্যারিয়ারের কথা ভুলে সেখানে খেলোয়াড়দের চলে যেতে। একসাথে রিদমে থাকা কয়েকজন খেলোয়াড় এক দলে গিয়ে জায়গা হয় বেঞ্চে। ক্লাবে তো এমনও দেখা গেছে, জাতীয় দলের দুই গোলকিপার একই দলে গিয়েছেন দলবদলে।

দুই-তিন মৌসুম বেঞ্চে কাটিয়ে হয়ত অনেক টাকার মালিক হওয়া যায়, কিন্তু শেষ হয় নিজের ধার, আত্মবিশ্বাস; শেষ হয় ক্যারিয়ার। সে খেলোয়াড়ই যখন জাতীয় দলে প্রতিনিধিত্ব করে তখন দূর্দান্ত গোলের আশা কিভাবে করা যায় তার কাছ থেকে!!

এ গোলকধাঁধার উত্তর খুব সহজ। কিন্তু বাস্তবায়ন কঠিন। এ জন্য প্রয়োজন ক্লাব, খেলোয়াড় উভয় পক্ষের আন্তরিক প্রচেষ্টা। তাতেই হয়ত একদিন এমন অপ্রীতিকর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে না আর কাওকে।

পুরোটা পড়ুন
কমেন্ট করুন/দেখুন

ট্রেন্ডিং টপিক